দক্ষতা ও কারিগরী শিক্ষার মূল্যায়ণ সবসময়ই ছিল এবং থাকবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর দক্ষতা অর্জন করে আপনিও নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন। হ্যাঁ, বর্তমান সময়ে গ্রাফিক্স ডিজাইন তেমনই একটি জনপ্রিয় পেশা, যা কর্মসংস্থানের পাশাপাশি একটি নিশ্চিত আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
আপনি যদি গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখতে
আগ্রহী হয়ে থাকেন এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনে আপনার ক্যারিয়ার গড়তে চান, তবে আজকের এই সংক্ষিপ্ত
প্রবন্ধটি আপনাকে একটি ধারণা দিতে পারবে বলে আশা করি। এই প্রবন্ধ থেকে আপনি যা জানতে
পারবেনঃ
Ø গ্রাফিক্স ডিজাইন কী
Ø এর কর্ম পরিশর ও কাজের বাজার
Ø গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়
Ø গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখার উপায়
Ø ডিজাইনের মূল ক্যাটাগরী বা প্রকারভেদ
কোন কিছুতেই আসলে শিখার শেষ নেই,
আপনি চাকুরী করুন আর ফ্রিল্যান্সিং করুন নিয়মিত কাজ করলে প্রতিনিয়তই শিখতেই থাকবেন।
‘‘গ্রাফিক্স ডিজাইন কী” এটা নিয়ে কতো পড়াশোনাই না করলাম আর আত্মতৃপ্তি পেয়েছি অনেক
কিছু শিখে ফেলেছি। যদি অনলাইন ক্লাসের সময় আমাদের প্রশ্ন করা হয় ‘গ্রাফিক্স ডিজাইন কী” তাহলে আমরা গুগুল করি আর উত্তর
দেই এভাবে, “চিত্রলেখ বিষয়ক শিল্পকর্মকেই গ্রাফিক্স ডিজাইন বলা হয়ে থাকে। সহজভাবে বলতে
গেলে টেক্সট বা নকশা ব্যবহার করে সুন্দর এবং মানসম্মত চিত্রকর্ম তৈরী করাকে গ্রাফিক্স
ডিজাইন বলে।” আসলেই তাই!
কিন্তু আমি ডিজাইন নিয়ে পড়াশুনা
করতে করতে জানতে পারলাম, গ্রাফিক্স ডিজাইন হচ্ছে, “প্রবলেম সলভিং” বা কোন সমস্যার সমাধান
করা। আসলেই গ্রাফিক্স ডিজাইন মানেই কোন ডিজাইনের মাধ্যমে কোন সমস্যার সমাধান করা বা
একটি প্রতিষ্ঠানের বা ব্যক্তির নিকট কোন মেসেজ বা উদ্দেশ্য ফুটিয়ে তোলা।
যেমনঃ আমরা রাস্তায় চলার পথে বা
কোন প্রতিষ্ঠানে এই চিহ্নগুলি দেখে থাকিঃ
মানে আমরা এগুলো দেখেই বুঝতে পারছি
যে, এই ডিজাইনগুলো দিয়ে একটা মেসেজ দেয়া হয়েছে। ঠিক একই ভাবে, আমরা একটি ফ্লায়ারের
মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের পণ্যের গুনগত মাণ,
ঐ প্রতিষ্ঠানের মিশন, বৈশিষ্ট , যোগাযোগের ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য পেয়ে থাকি এবং
ঐ প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা নেয়ার জন্য যাই।
তাই ডিজাইন করার সময় আমাদের অবশ্যই
খেয়াল রাখতে হবে যে, আমাদের ডিজাইনটি সত্যিই কোন মেসেজ দিচ্ছে কীনা, কোন সমস্যার সমাধান
করার জন্য ডিজাইন ও রং ব্যবহার করা হয়েছে কী না, ব্যবহ্রত ফন্টগুলো মানাণসই হয়েছে কী
না। লেখা বা শোনার চেয়ে দৃশ্যমান যে কোন কিছু সহজে আমাদের বেশী আকর্ষণ করায় প্রতিনিয়ত
গ্রাফিক্স ডিজাইনের চাহিদা বাড়ছে।
গ্রাফিক্স ডিজাইন করতে গেলে প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও সৃজনশীলতা থাকতে হবে। অলসতা ত্যাগ করে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে একজন সত্যিকারের গ্রাফিক্স ডিজাইনার হওয়া সম্ভব।
গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের কর্মপরিসর ও কাজের বাজারঃ
বর্তমান অনলাইন ব্যবসায়ের যুগে
গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও ওয়েব ডিজাইনারদের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটি জড়িপে এসেছে
যে, প্রতি মিনিটে বিশ্বে ৩৮০ টি ওয়েব সাইট তৈরী হচ্ছে। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের লোগো,
বিজনেস কার্ড, প্রচার ইত্যাদির জন্য গ্রাফিক্স ডিজাইনারের প্রয়োজন হচ্ছে। অনেক গ্রাফিক্স
ডিজাইনার ফ্রিল্যান্সিং এর কাজের পাশাপাশি ধীরে ধীরে নিজের একটি টিম নিয়ে কাজ করছে।
তাই গ্রাফিক্স ডিজাইনের চাহিদা দিন দিন বাড়বে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে আপনাকে
সফল হতে হলে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, আপনার সৃজনশীলতা হতে হবে বিশ্বমাণের ও রুচিসম্পন্ন
। তাহলেই আপনি চাকুরী অথবা ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রসমূহে দাপটের সাথে
কাজ করতে পারবেন।
Ø বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করা যায়
Ø বিপনণ কোম্পানীতে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে কাজ করা যায়
Ø ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানী
Ø ম্যাগাজিন ও নিউজপেপার
Ø ওয়েবসাইট ও এ্যাপ ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী
Ø গেম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী
Ø ডিজিটাল মিডিয়া ও টেলিভিশন কোম্পানী
Ø পোষাক তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান
এই সেক্টরে কাজ করার আরেকটি বড়
সুবিধা হলো, আপনি এখানে আপনার মেধা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে সাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন।
তাই আপনি চাকুরীর পিছনে না ছুটেও অনলাইনে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কাজ ঘরে বসেই করতে
পারবেন।
গ্রাফিক্স ডিজাইন শিখে ফ্রিল্যান্সিং ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আয়ঃ
আমাদের দেশে অনেক দক্ষ ও নামী ফ্রিল্যান্সার
রয়েছে, যারা বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসগুলোতে সুনামের সাথে কাজ করছে। তবে
আন্তর্জাতিক বাজারে অন্যান্য ফ্রিল্যান্সারদের সাথে প্রতিযোগিতা করার জন্য যথেষ্ঠ অভিজ্ঞতার
প্রয়োজন রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করতে গেলে সারা বিশ্বের ডিজাইনারদের সাথে
যুদ্ধ করে আপনাকে টিকে থাকার যোগ্যতা অর্জন করে নিতে হবে। আমাদের দেশের ফ্রিল্যান্সাররা
সাধারণতঃ ফাইভার, আপওয়ার্ক, ফ্রিল্যান্সার, পিপল পার আওয়ার, ৯৯ডিজাইন, এনভাটো ইত্যাদি
মার্কেটপ্লেসে কাজ করে থাকে।
আবার অনেক দক্ষ ফ্রিল্যান্সার ফ্রিল্যান্সিং পাশাপাশি অনলাইনে প্রশিক্ষণ দিয়েও আয় করতে পারে। কাজের ধরণের উপর ভিত্তি করে আমাদের দেশে একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনারের সম্মানী ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে আপনি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস থেকে এক্টিভ ও প্যাসিভ দুই উপায়েই আয় করতে পারেন। এজন্য আপনাকে র্ধৈয ধরে লেগে থাকতে হবে এবং প্রতিনিয়ত দক্ষতা উন্নয়ণের উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
যারা শুরু থেকে গ্রাফিক্স ডিজাইন
শিখতে চান, তারা প্রথমেই ইউটিউব এর ভিডিও দেখে শিখা শুরু করতে পারেন। বেসিক টু এডভান্সড
অনেক সিরিজ টিউটরিয়াল আছে যেগুলো দেখে সহজেই আপনি আপনার শিখার সূচনা করতে পারেন। কারণ,
হুট করে কোন পেইড কোর্সে ভর্তি হলে বেসিক না জানলে ঐসব ক্লাসের সাথে আপনি শিখার ভারসাম্য
রাখতে পারবেন না । তবে এই বিষয়ে আরো দক্ষ ও পেশাদারী হতে হলে আপনাকে Masters in Graphics
Design এর
মতো আরো উন্নত কোর্সগুলো করতে হবে। তবে স্বল্প সময়ের ভিতর আপনি ৬-৮ মাস মেয়াদী ডিপ্লোমা
কোর্স করে আপনার ডিজাইন ক্যারিয়ার শুরু করতে পারেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন মেয়াদে
কোর্স পরিচালনা করে থাকে। আপনি আপনার সুবিধামতো কোর্স পছন্দ করে নিতে পারেন।
এছাড়া আপনি সরকারী কোন প্রতিষ্ঠানেও
প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, যেমনঃ ইশিখন। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণের
জন্য রয়েছে LEDP, যেখানে আপনি ভর্তি হয়ে আপনার পছন্দের বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে
পারেন। তবে আপনাকে অনুরোধ করব দয়া করে কোন ফ্রি কোর্সে এররোল করে নিজেকে পণ্য বানাবেন
না।
বেস্ট ইউটিউব চ্যানেলঃ
Learn with shohagh
Maxpoint Hridoy
Dnezel
Ggxmentor
Vectstock
Be designer
Anisur Rahman Pro
Xvect
সেরা প্রতিষ্ঠানঃ
অনলাইন কোর্সঃ
ইউটিউব এবং গুগুল থেকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর ধারণা নেয়ার পর ঐগুলো ভালোভাবে অনুশীলন করে টুলসের ব্যবহার আয়ত্বে আনতে হবে। তারপর কোন পছন্দনীয় প্রতিষ্ঠানে বা অনলাইন/অফলাইন গ্রাফিক্স ডিজাইন কোর্সে ভর্তি হতে হবে। আজকাল ফেসবুক নিউজফিডে প্রচুর স্পন্সরড বিজ্ঞাপন দেয়া থাকে, যেগুলোতে খুবই অল্প টাকায় শেখানোর কথা থাকে, অথবা শুধুমাত্র রেজিষ্ট্রেশন করে শেখানোর কথা থাকে। এধরণের প্রতিষ্ঠানে ঝোঁকের মাথায় ভর্তি হওয়া যাবে না।
ডিজাইনের মূল ক্যাটাগরী বা প্রকারভেদঃ
আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিং বা চাকুরীর
ক্ষেত্রে গ্রাফিক্স ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে চান, তবে প্রথমেই ডিজাইনের কোন ক্যাটাগরী
বা বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান তা নির্বাচন করতে হবে। আমরা এই সেক্টরে বিভিন্ন ধরণের ক্যাটাগরী
বা বিষয়ভিত্তিক কাজের দক্ষতা দেখতে পাই। মূলতঃ পুরো গ্রাফিক্স ডিজাইন সেক্টরটিকে আমরা
প্রথমেই দুইভাগে ভাগ করে নিতে পারি। যেমনঃ ১) প্রিন্ট এলিমেন্টস ২) ওয়েব এলিমেন্টস।
তাই আপনি আপনার দক্ষতা উন্নয়ণের সময় আপনার পছন্দের বিষয়টি বেছে নিতে ভুলবেন না যেন।
গ্রাফিক্স ডিজাইন ক্যাটাগরী নিয়ে পরবর্তীতে আরেকটি বিস্তারিত পোষ্ট থাকবে আপনাদের জন্য।
তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি নিম্নোক্ত আট ধরণের গ্রাফিক্স ডিজাইনের বিষয় দেখতে পেয়েছি।
যেমনঃ
১. চাক্ষুষ বা দৃশ্যমাণ পরিচয় ডিজাইন
বা Visual
identity graphic design
২. বিপনণ ও প্রচারপত্র ডিজাইন বা Marketing & Advertising Graphic Design
৩. ওয়েবসাইট বা এ্যাপ ব্যবহারকারীর
জন্য ডিজাইন বা User Interface Graphic Design
৪. প্রকাশনা শিল্পের ডিজাইন বা Publication
Graphic Design
৫. মোড়ক ডিজাইন বা Packaging
Graphic Design
৬. চলমান গ্রাফিক্স ডিজাইন বা Motion
Graphic Design
৭. শিল্প ও চিত্রণ গ্রাফিক্স ডিজাইন
বা Art & Illustration Graphic
Design
৮. পরিবেশ বিষয়ক গ্রাফিক্স ডিজাইন
বা Environmental Graphic Design
উপরোক্ত এই আট ধরণের ক্যাটাগরীর
ভিতরেই মূলতঃ সবধরণের ডিজাইন সম্পর্কিত বিষয়গুলো লুকায়িত রয়েছে। একজন ডিজাইনারের সবধরণের
ডিজাইন সম্পর্কেই আইডিয়া থাকতে পারে, তবে তাকে যেকোন একটি বিষয় নিয়ে কাজ করে দক্ষতা
অর্জন করতে হবে।
আশা করি উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আপনারা গ্রাফিক্স ডিজাইন সম্পর্কে একটি একটু হলেও ধারণা পেয়েছেন। তাহলে সিদ্ধান্ত নিন এবং রিসার্চ করুন কিভাবে, কোথা থেকে শুরু করতে পারেন। ডিজাইন সম্পর্কিত আরো লেখা পড়তে আমাদের ব্লগের সাথেই থাকুন। আপনাদের জন্য রইল অনেক অনেক শুভ কামনা। লেখাটি ভালো লেগে থাকলে মতামত জানানোর অনুরোধ রইল।
ধন্যবাদ সবাইকে।
আমাদের ফেসবুক গ্রুপ: https://www.facebook.com/designpagebangla
ইন্সটাগ্রামঃ https://www.instagram.com/designpagebangla
পিন্টারেস্টঃ https://www.pinterest.com/designpagebangla
ইউটিউবঃ https://www.youtube.com/@designpage
লেখনীতে: খন্দকার ফারুক আহমেদ
ব্লগার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর




2 মন্তব্যসমূহ
খুবই সুন্দর ও তথ্যবহুল হয়েছে প্রবন্ধটি। গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর আরো প্রবন্ধ দেয়ার অনুরোধ রইল।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ জানাই লেখককে। চমৎকার হয়েছে।
উত্তরমুছুন